কৃষি বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় না করে এবং উপজেলা ও জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির অনুমোতি না নিয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন কর্তৃক এক তরফাভাবে শুধুমাত্র বিসিআইসির তালিকাভূক্ত ১৫ সার ডিলারের বিরুদ্ধে মামলা করায় শেরপুরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একইসাথে এ সংক্রান্ত বিষয়ে ওই কর্মকর্তার সাথে শেরপুরের জেলা প্রশাসকের কথোপকথনের ফোনালাপের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জেলায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এ বক্তব্য ফাসঁ করা অভিযোগও ওঠেছে ওই কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই। একইসাথে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন ও বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টির দায়ে ওই কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে দাবি ওঠেছে।
দায়ী কৃষি কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনার দাবী
শেরপুরের ডিসির সাথে কথোপকথনের কলরেকর্ড ফাঁস করার অভিযোগ কৃষিকর্মকর্তা আনোয়ারের বিরুদ্ধে
শেরপুরের ডিসির সাথে কথোপকথনের কলরেকর্ড ফাঁস করার অভিযোগ কৃষিকর্মকর্তা আনোয়ারের বিরুদ্ধে
শেরপুর সদর উপজেলায় বিসিআইসি তালিকাভূক্ত ১৫ জন ও বিএডিসির তালিকাভূক্ত ৫৫জনসহ মোট ৭০জন সার ডিলার রয়েছে বলে শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার জানান। এদের মধ্যে ইউরিয়া সার বরাদ্দ পায় শুধুমাত্র বিসিআইসি সার ডিলারগণ। আর এমওপি, ডিওপি, টিএসপি, পটাসসহ নন ইউরিয়া সার বরাদ্দ পান বিএডিসির তালিকাভূক্ত ডিলাররা। জেলা সদরে সম্প্রতি বছরগুলোতে ধানের পরিবর্তে সবজি ও কলা চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরিয়ার চেয়ে ননইউরিয়া সারের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেশী। এসব ফসলে নন ইউরিয়া সাররে চাহিদা বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুন। সদর উপজেলায় ননইউরিয়া সারের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে অধিক মূল্য আাদায় করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ বিএডিসির তালিকাভূক্ত সার ডিলারদের বিরুদ্ধে। ১০৫০ টাকা বস্তা সার দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করার অভিযোগ রয়েছে কৃষকদের। এনিয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বহুবার খবরও প্রচারিত হয়েছে।
এদিকে বিসিআইসি সার ডিলার বিপনন কেন্দ্রগুলোতে উপজেলা ও ইউনিয়নে কর্মরত কৃষি কর্মকর্তাদের টেগ অফিসার নিয়োগ করা থাকে পূর্ব থেকেই। টেগ অফিসারগণ বিসিআইসি সার ডিলারদের প্রতিদিনের ক্রয়-বিক্রয় ও মজুদের রেকর্ড সংরক্ষন করেন। এরফলে বিগত দুই বছরে শেরপুর জেলায় ইউরিয়া সারের সঙ্কট হতে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে যদি কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে শুধু ডিলার নয় কৃষি বিভাগও জড়িত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ অবস্থায় শেরপুর সদর উপজেলার তৎকালীন কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার আনোয়ার হোসেন বিএডিসি সার ডিলার ও সংশ্লিষ্টদের পাশ কাটিয়ে উর্ধতন কর্মকর্তা এবং সার বীজ মনিটরিং কমিটির অনুমোতি ছাড়াই শেরপুরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার সার কালোবাজারি ও পাচারের অভিযোগ এনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১৫ জন ডিলার ও তাঁদের পাঁচ কর্মচারীসহ মোট ২০ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করেন।
এর আগে বিসিআইসি সার ডিলারগণ ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোটা অংকের উৎকোচ দাবী ও গ্রহণের অভিযোগ এনে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। এনিয়ে ডিলারদের সাথে চরম বিরোধ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার। তাই তিনি বিসিআইসি সার ডিলারদের ওখানে পরিদর্শনের নামে তাদের স্টক খাতা, রশীদ বইসহ অন্যান্য কাগজপত্র জব্দ করে নিয়ে আসেন। যা এখন পর্যন্ত ডিলারদের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি। এনিয়েও চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। পাল্টা-পাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হলে শেরপুর সদর থানায় বিসিআইসির ১৫ জন ডিলার ও তাঁদের পাঁচ কর্মচারীসহ মোট ২০ জনের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৪ কোটি টাকার সার কালেবাজার ও পাচারের অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করেন। পরে তিনি বদলী জনিত কারণে দ্রুত চট্রগ্রামে চলেযান।
এঘটনার পর জেলা বিসিআইসি সার ডিলার এসোসিয়েশনের সভাপতি অসুস্থ রাশেদুজ্জামান জেলে যাওয়ার ভয়ে আরো অসুস্থ হয়ে সম্প্রতি হাসপাতালে মারা যান। এছাড়া ওই মামলার ১৬জন জেলা কারাগারে হাজতবাসের পর জামিনে মুক্ত হয়ে আসেন।
মামলা ও অভিযোগ দায়েরের পর সার ডিলারসহ সার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা এবং সারের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তাকে শেরপুরে থেকে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে তার সাথে জেলা প্রশাসক মোবাইলে কথা বললে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড স্থানীয় তার পছন্দের সাংবাদিকদের কাছে প্রদান করেন। এ ফোন রেকর্ডটি ২/১টি অখ্যাত ফেইসবোক পেইজে প্রচার করলে এ নিয়ে জেলায় বিভ্রান্ত সৃষ্টি হয়। যা সরকারি চাকরি বিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওতে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়ে আনোয়ার হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে শোনা যায়। কথোপকথনে তিনি সার মনিটরিং ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে নিজের দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানোর কথা বলেছিলেন।
অডিওতে জেলা প্রশাসককে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি আমাকে ফরমালি জানাবেন আপনার ডিডির মাধ্যমে। আপনি মামলা করতে গেলেন কেন?’ কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিব্রত করার বিষয়েও আপত্তি জানান।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি সরকারকে বিব্রত করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি আনোয়ার হোসেনকে ফোন করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া ফোনালাপ রেকর্ড করা ঠিক হয়নি।
এদিকে শেরপুরের জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা ইয়াসমিন শেরপুরে যোগদানের পর থেকে তার জনবান্ধব কার্যক্রমে খুশি জেলার সিংহভাগ মানুষ। জেলা প্রশাসকের সাথে এমন আচরণে ক্ষুব্ধ অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওই কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন।
চরাঞ্চল ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি এমএ রশীদ বিএসসি বলেন, বর্তমান জেলা প্রশাসক একজন মানবিক জেলা প্রশাসক। তার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র শেরপুরবাসী মেনে নিবেনা। যে কৃষি কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের বক্তব্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর দায়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানাই।
শেরপুর ফুটবল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ও তরুণ আইনজীবী এডভোকেট মেহেদী হাসান পাপুল বলেন, ওই কৃষি কর্মকর্তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি। একই দাবি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবিদের।
তৎকালীন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি তদন্ত শুরু করার পর আমার বিরুদ্ধে একেরপর এক অভিযোগ ও শুকোজ করায় দ্রুত এ মামলা দায়ের করতে হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কলরেকর্ড ফাসেঁ কথা অশ্বীকার করেন তিনি।
এবিষয়ে শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নীলু বলেন, সার বীজ নিয়ে যে কোন সমস্যা হলে উপজেলা সারবীজ মনিটরিং কমিটিকে অবগত করাই। আমাদের হাতে মামলা করার এখতিয়ার থাকলেও যে কোন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয় সার বীজ মনিটরিং কমিটিকেই। কাজেই এ কমিটির অনুমতি ছাড়া এককভাবে বড় কিছু করতে পারিনা। এছাড়া সার আইনে সবোচ্চ শাস্তি ৩০ হাজার টাকা। কোন ডিলার অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন সারবীজ মনিটরিং কমিটি। যে কোন ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশ একমাত্র এ কমটিই করতে পারেন। এ মামলা করা আগে তার কাছ থেকেও কোন অনুমতি নেয়া হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবদি শওকত হোসেন বলেন, এ সংক্রান্ত মামলা দায়েরের বিষয়ে আমার বা আমাদের কোন কর্মকর্তার কোন অনুমতি নেয়া হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন তাই তদন্তেই সবকিছু বেড়িয়ে আসবে।
জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আমি সঠিক পথেই এগোতে চাই। জেলার কৃষকরা যাতে সঠিকভাবে সার বীজ পান আমি এটাই চাই। আমি কোন ডিলারকে চিনিনা। কৃষকদের জন্য আমি রাতদিন দাড়িয়ে থেকে হলেও আমার দায়িত্ব পালন করতে চাই।
মন্তব্য