জীবন দিয়ে মুক্তি- হাসান শরাফত

 

পুরাতন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা বার বার চোখের পানি মোছছেন। তা দেখে সদ্য কলেজে পা রাখা বিথি তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ বৃদ্ধা মানুষের আগমন টের পেয়ে পেছন ফিরে তাকান। আপনি কে? এটা তো আমার ছোট দাদীর কবর। আপনি কি আপনার আত্নীয় মনে করে এই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাদঁছেন।
না দাদু, আমি ভুল করে এই কবরের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। আমি জেনে শুনেই এখানে আসছি।
১৯৭১ সাল। আমি তখন তুমার মতই কলেজে পা রেখেছি। দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। পড়াশুনায় কারো মন নেই। সবার চিন্তা কিভাবে এই দেশকে মুক্ত করবে। আর কত বৈষম্য, অত্যাচার মেনে নেওয়া যায়। দেশে মু্ক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা কলেজের কয়েকজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিব। আমরা জানতাম আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ স্যার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন এবং গোপনে অনেক লোককে মু্ক্তিযুদ্ধে পাঠাচ্ছেন। তাই তো আমরাও গেলাম অধ্যক্ষ আতাউর রহমান স্যারের কাছে আমাদের নাম লেখাতে। প্রথমে স্যার তো আমাদের নিতেই চাইলেন না, বললেন বাবারা তোমরা আমার সন্তানের মত, আমার ছাত্র। আমার চোখের সামনে তোমাদের মৃত্যু আমি সহ্য করতে পারব না। আমরা বললাম, স্যার আপনি যদি আপনার জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে পারেন, আমরা কেন পারব না। অনেক পিড়াপিড়িতে অবশেষে স্যার আমাদের নাম তালিকাভূক্ত করলেন। প্রশিক্ষণের জন্য পরের সপ্তাহে সীমানা পার হয়ে অপারে যেতে হবে। তাই সুলতানার সঙ্গে শেষ দেখা করে বিদায় নিতে গেলাম। সুলতানা ছিল স্কুল জীবন থেকে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি বরাবরই ক্লাসে প্রথম হতাম, সুলতানা দ্বিতীয়। একবার কি হয়েছিল জান! পরীক্ষার আগে সুলতানা বলেই ফেলল, এবার যদি প্রথম হতে না পারি তাহলে এ জীবন রাখব না। খুব জেদি ছিল সে।
তারপর!
তারপর আমি গণিত পরীক্ষায় ইচ্ছা করেই একটি অংক ভুল করলাম এবং ইংরেজী রচনা লিখলাম অর্ধেক। যাতে করে সুলতানা পরীক্ষায় প্রথম হতে পারে। সত্যি সত্যি সুলতানা প্রথম হলো। একদিন রফিকের সাথে গর্বের সহিত বলল, বলছিলাম না আমি এবার ক্লাসে প্রথম হবোই। রফিক ছিল আমার কাছের বন্ধু। সে বলেই ফেলল জীবনেও তুই ক্লাসে প্রথম হতে পারতি না যদি শামীম তোকে প্রথম হওয়ার সুযোগ না দিত। তোকে প্রথম করার জন্য ইচ্ছা করেই দুটি পরীক্ষা সে খারাপ করেছে এবং তার সাক্ষী আমি। আমাকে বলতে নিষেধ করেছিল।
কি বললি তুই, শামীম আমার জন্য…..
পরের দিন সুলতানা ক্লাসে এসে একটি কলম উপহার দিয়ে বলল, এই যে মহান মানুষ আপনাকে অভিনন্দন। সেই থেকে দুজনের প্রতি দুজনার দূর্বলতা তৈরি হতে থাকে।
একবার কি হলো জান! স্কুলে পড়া অবস্থায় আমাদের ক্লাসের রুপসির বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। তার বাড়ি পাহাড়ি সিমান্ত এলাকায়। সে এখানে মামার বাড়ি থেকে লেখাপড়া করত। তার গ্রামে বিয়ের আয়োজন করায় এবং সুন্দর পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা কয়েকজন বন্ধু হাজির হই। সুলতানা ও রেশমিও ছিল আমাদের সাথে। সেখানে আমরা তিন দিন ছিলাম। সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছি। সবাই বুঝত আমরা একে অপরকে পছন্দ করি তাইতো মাঝে মাঝে বনো রাস্তায় আমাদের কে কথা বলার সুযোগ দিয়ে ওরা দূরে দূরে ঘুরত। ঐ তিন দিনেই আমাদের ভাললাগা গভীর ভালবাসায় রুপ নেয়।
তারপর!
সেখান থেকে চলে আসার পর একদিন দেখা না হলেই অস্থির হয়ে যেতাম। ঐ যে খালটি দেখছ না এখন তো কত সরু হয়ে গেছে। একসময় বিশাল খাল ছিল এটা। খালের পাড়ে বসে বড়শি দিয়ে প্রতিদিন মাছ ধরতাম। উদ্দেশ্য মাছ ধরা নয়, সুলতানাকে একটু দেখতে পাওয়া।
যাকে একদিন দেখতে না পেলে থাকতে পারতাম না, তাকে রেখে নিশ্চিত মৃত্যু পথে পা বাড়িয়েছি, কোনদিন ফিরে আসতে পারব কি না জানি না। তাইতো শেষ বারের মত সুলতানার সাথে দেখা করে বাড়ি ফিরছিলাম। এমন সময় পাকিস্তানী মিলিটারিরা আমাকে গ্রেফতার করে ফেলে। খবর পেয়েছে আমি নাকি মুক্তি যুদ্ধে যোগ দিয়েছি। আমার হাত, চোখ বেধেঁ তাদের ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।
এই খবর সুলতানার কাছে পৌঁছার সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। তাদের হাতে পায়ে ধরে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। সুলতানা যেমন ছিল মেধাবী, দেখতেও ছিল অপরুপ সুন্দরী। তার ডাগর ডাগর হরিণী চোখের দিকে যে কেউ তাকালে তার মায়ায় পরে যেত। সুলতানাকে দেখে পাক বাহিনীর বড় কর্তা খুব খুশি হলেন, বললেন ঠিক আছে তুম সাথ যাও, তুমার পিয়ারা বন্ধুকে ছেড়ে দেই বলেই আমাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে সুলতানাকে গাড়িতে তুলে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। কয়েকবার রাতের অন্ধকারে তাকে উদ্ধার করতে গিয়েও ব্যার্থ হয়ে কোন রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছি।
তারপর!
তারপর চলে যাই প্রশিক্ষণে। চোখের ভেতর আগুন আর বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। নিজে কে বড় স্বার্থপর, অপরাধী মনে হয়। আমার জন্য নিঃস্পাপ সুলতানা নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে। প্রতিজ্ঞা করি, প্রশিক্ষণ শেষে প্রথম অপারেশন চালাব জীবননগর ক্যাম্পে, যেখানে সুলতানা আটক আছে।
দিনকে দিন দেশ আরো ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হয়। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবিসহ এদেশের নিরীহ বাঙ্গালীদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতে থাকে। অসংখ্য মা বোনদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলে।
একদিন জীবননগর কলেজের অধ্যক্ষ স্যার কে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, সাথে দুজন ছাত্রকেও। অধ্যক্ষ স্যার মুক্তিযোদ্ধা কি না তাদের কাছে স্বীকার উক্তি চাইলে তারা জানে না বললে সঙ্গে সঙ্গেই স্যারের সামনে গুলি করে মেরে ফেলে। স্যার কে রশি দিয়ে গাছের সাথে বেধেঁ রাখে।
তারপর!
সুলতানাও ছিল ঐ ক্যাম্পে, স্যারের এই অবস্থা দেখে ডুকরে ডুকরে কাদঁতে থাকে। এবং কিভাবে স্যারকে মুক্ত করবে তার উপায় খুজে। রাত প্রায় শেষের দিকে, এমন সময় মিলিটারি কর্তা চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়লে আস্তে করে দড়জা খুলে বেড়িয়ে আসে সুলতানা। তারপর অধ্যক্ষ স্যারের কাছে এসে বলে, আমি সুলতানা স্যার, জীবননগর কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আপনার হাতপায়ের বাধঁন খুলে দিচ্ছি স্যার, আপনি চলে যান। স্যার বাধাঁ দিয়ে বলে তুমি চলে যাও মা, ওরা দেখে ফেললে তুমাকে মেরে ফেলবে। আমার জন্য চিন্তা করবেন না স্যার, আমি তো অনেক আগেই মরে গেছি। শুধু এই শারিরীক কাঠামো ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই স্যার। আপনি বাচঁলে এই দেশ বাচঁবে। আপনার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিবে স্যার। স্যারের চোখ বেয়ে টপ টপ করে পানি ঝরতে থাকে।
এমন সময় মিলিটারীর বড়কর্তা টের পেয়ে দৌড়ে এসে দেখে অধ্যক্ষকে মুক্ত করে দিচ্ছে সুলতানা। সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালায় অধ্যক্ষ স্যারকে লক্ষ্য করে।
তারপর!
তারপর দৌড়ে গিয়ে সুলতানা অধ্যক্ষ স্যারের সামনে দাঁড়ায়। গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে সুলতানা।
আমরা তখন ঐ ক্যাম্পটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছি। গুলির শব্দ শুনে চারদিক থেকে গুলি চালাতে চালাতে ক্যাম্পে ঢুকে পড়ি। ততক্ষণে পাক বাহিণীর সবাই খতম। মাঠের বড় গাছের নিচে তাকিয়ে দেখি সুলতানার রক্তাক্ত লাশ পরে আছে। পুকুর থেকে উঠে এসে ভেজা শরীরে অধ্যক্ষ স্যার সুলতানার লাশের পাসে বসে আছেন। আমাদের দেখে অধ্যক্ষ স্যার কেদেঁ কেদেঁ বললেন দেখ আমাদের সুলতানাকে স্বাধীন দেশের পতাকার লাল বৃত্ত আকার জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়ে গেল অবলিলায়। নির্বাক আমি দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি সুলতানার দিকে আর আমার দুগাল বেয়ে টপ টপ করে ঝরছে দুচোখের অশ্রু।
আমি বীরমুক্তিযোদ্ধা শামীম আহমেদ। তুমি আমাকে চিনবে না দাদু, এখানে যে ঘুমিয়ে আছে সে আমাকে ভাল করেই চিনে। তার জন্যই হয়ত আজও পৃথিবীতে বেচেঁ আছি। আমি কয়েকদিন হলো দেশে ফিরেছি। আমার ছোট ভাই এর পরিবারের সাথে বিদেশে থাকি।
কোন এক অজানা কারণে বিথির দু’চোখ বেয়েও অঝর ধারায় ঝরতে থাকে অশ্রু।

Top
ঘোষনাঃ