সব খোলা রেখে গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রীর শর্তে যান সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির শঙ্কা

ফের ভাড়া-ভোগান্তির খড়ূগ!

ফাইল ছবি
সর্বমোট পঠিত : 35 বার
জুম ইন জুম আউট পরে পড়ুন প্রিন্ট

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেছেন, করোনা সংক্রমণ রোধে বাসে ভিড় কমাতে অর্ধেক সংখ্যক আসন খালি রাখার সিদ্ধান্ত ভালো। কিন্তু কীভাবে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে, তা বোধগম্য নয়। আগেও এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। অর্ধেক সংখ্যক সিট খালি রাখলে যান সংকট কীভাবে দূর করা হবে, তার নির্দেশনা নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসায়িক কার্যক্রম- সব খোলা রেখে গণপরিবহনে আসনের অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন নিয়ে আবার নৈরাজ্যের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাস ও লঞ্চ মালিকরা আগের মতোই ভাড়া বৃদ্ধি চান। ফলে বাড়তি ভাড়ার জন্য কৃত্রিম সংকটের শঙ্কা জেগেছে। পাশাপাশি এমনিতেই কর্মদিবসে অফিস শুরু ও ছুটির সময়ে রাজধানীর বাসে আসন পাওয়াই দুস্কর। বাদুড়ঝোলা হয়ে যাত্রীরা বাসে চড়েন। আর যাত্রার পাঁচ দিন আগে বিক্রি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফুরায় ট্রেনের টিকিট। এমন বাস্তবতায় আসনের অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী পরিবহনে যানবাহন সংকট হওয়া এক প্রকার নিশ্চিত।

করোনার সংক্রমণ রোধে গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, সে অনুযায়ী ১৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে গণপরিবহনে অর্ধেকের বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। বাস কীভাবে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলবে, ভাড়া কত বাড়বে- আজ বুধবার বেলা আড়াইটায় বাস মালিকদের সঙ্গে পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে।

অন্যদিকে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের টিকিট আগাম বিক্রি হয়ে যাওয়ায় ট্রেন আগামী ১৫ জানুয়ারি শনিবার থেকে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলবে। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী জানিয়েছেন, যাত্রী অর্ধেক সংখ্যক নেওয়া হবে, কিন্তু ভাড়া বাড়বে না।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণ রোধের 'লকডাউনে' প্রথম দফায় ৬৮ দিন বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ ছিল। সে বছর ১ জুন থেকে আসনের অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে বাস চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার। মালিকদের প্রস্তাবে সেবার বাস ও লঞ্চের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। গত বছর দুই দফা 'লকডাউন'-এর পরও একই হারে ভাড়া বাড়িয়ে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলেছিল বাস-লঞ্চ।
ডিজেলের দাম লিটারে এক লাফে ১৫ টাকা বাড়ায় গত ৮ নভেম্বর বাসের ভাড়া ২৭ থেকে ২৯ শতাংশ বেড়েছে। লঞ্চে ভাড়া ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলার শর্তের কারণে দুই মাসের ব্যবধানে ফের ভাড়া বাড়লে তা যাত্রীদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আগেও অর্ধেক সংখ্যক সিট খালি রাখার শর্ত মানা হয়নি। কিন্তু ৬০ শতাংশের পরিবর্তে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এবারও তা-ই হতে পারে। এর চেয়ে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় কঠোর জোর দিয়ে আসনের সমান সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা দেওয়া উচিত।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, বাসে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের সরকারি নির্দেশনা কীভাবে কার্যকর করা হবে- এ বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভাড়া বৃদ্ধি বৈঠকের উদ্দেশ্য নয়। বিআরটিএর কাছে সবার আগে জনস্বার্থ। বৈঠকে যদি ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব আসে, তা যৌক্তিক হলে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আগেরবার অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলার শর্ত মানতে মালিকরা ৮০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিল। পরে মন্ত্রণালয় ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির অনুমতি দিয়েছিল। পরিবহন মালিক সূত্র জানিয়েছে, অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলতে অন্তত ৫০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি চান তারা।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, অর্ধেক সংখ্যক সিট খালি রাখলে মালিকের লোকসান হবে। লোকসান পোষাতে যতটা ভাড়া না বাড়ালেই নয়, ততটা বাড়াতে হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু খোলা রেখে গণপরিবহনে অর্ধেক সংখ্যক আসন খালি রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়। এতে শুধু ভাড়া বাড়বে। বাস্তবে দেখা যাবে, যানবাহন সংকটের কারণে বাস যাত্রীবোঝাই হয়েই চলছে।
রাজধানী ও আশপাশের রুটে চলাচলকারী বাস সংখ্যা সোয়া ছয় হাজার। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, দৈনিক চার থেকে সাড়ে হাজার বাস চলাচল করে। যা সকালে ও বিকেলে 'পিক আওয়ারে' পর্যাপ্ত নয়। লোকাল হিসেবে চলা বাসে দাঁড়ানোসহ আসনের দেড় থেকে দুই গুণ যাত্রী থাকে। অর্ধেক সংখ্যক আসন খালি রাখলে পিক আওয়ারে তিন থেকে চার গুণ বাস লাগবে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেছেন, করোনা সংক্রমণ রোধে বাসে ভিড় কমাতে অর্ধেক সংখ্যক আসন খালি রাখার সিদ্ধান্ত ভালো। কিন্তু কীভাবে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে, তা বোধগম্য নয়। আগেও এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। অর্ধেক সংখ্যক সিট খালি রাখলে যান সংকট কীভাবে দূর করা হবে, তার নির্দেশনা নেই।

তিনি বলেন, অর্ধেক সংখ্যক সিট খালি রাখলে ভাড়া বাড়াতে হবে। যাত্রী ও মালিক- উভয় পক্ষই করোনার কারণে আর্থিকভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছেন। তাই যাত্রীর ওপর বাড়তি ভাড়ার বোঝা না চাপিয়ে সরকারকেই প্রণোদনা দিতে হবে।

ডিজেলের দাম বাড়ার আগে মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসে ভাড়া ছিল ২০ টাকা। এখন ২৬ টাকা হয়েছে। অর্ধেক সংখ্যক আসন খালি রাখার কারণে ভাড়া ৫০ শতাংশ বাড়লে হবে ৩৯ টাকা। অর্থাৎ ভাড়া দুই মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

আগের বিধিনিষেধ চলাকালে অ্যাপভিত্তিক গাড়িতেও আসনের অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলার নিদের্শনা দেওয়া হয়েছিল। বন্ধ ছিল মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন। এবারও এমন সিদ্ধান্ত আসবে কিনা- এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, যেসব যানবাহনে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন সম্ভব নয়, সেগুলো বন্ধ রাখতে হবে। তবে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত বৈঠকে হবে।

ট্রেনে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন বিষয়ে গতকাল রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সাহাদাত আলী বলেছেন, ১৩ জানুয়ারি থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানায় জোর দেওয়া হবে। যারা আগে টিকিট কিনেছেন, তারা যেতে পারবেন।

রেলওয়ের উপপরিচালক নাহিদ খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়েছে, ট্রেনের টিকিটে কোটা থাকবে না। অর্ধেক সংখ্যক আসনের টিকিটের ৫০ ভাগ অনলাইন ও অ্যাপে এবং বাকি ৫০ শতাংশ স্টেশনের কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে।

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, লঞ্চে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন ও ভাড়া বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অন্যান্য গণপরিবহনের কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা দেখে এক-দুই দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মন্তব্য

আরও দেখুন

নতুন যুগ টিভি