সুগন্ধা ট্র্যাজেডি

তিন 'বড় ভুলের' কথা স্বীকার লঞ্চ মালিকের

সর্বমোট পঠিত : 59 বার
জুম ইন জুম আউট পরে পড়ুন প্রিন্ট

র‌্যাব জানায়, ঘটনার দিন দুপুরে লঞ্চ মালিকের নির্দেশনা ছিল, যে কোনো উপায়ে অন্য লঞ্চের চেয়ে তিন ঘণ্টা আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। যাতে বেশি যাত্রী পাওয়া যায়। তাই দ্রুতগতিতে লঞ্চ চালানোর নির্দেশনা ছিল হামজালালের। ইঞ্জিন বদলের পর তিনবার বিভিন্ন গন্তব্যে লঞ্চটি গিয়েছিল। যাত্রীদের জন্য কোনো লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা ছিল না। শুধু তার কর্মচারীদের জন্য ২২টি লাইফ জ্যাকেট ছিল। যাত্রীদের জন্য ছিল ১২৭টি বয়া। তবে অধিকাংশ বয়াই যথাস্থানে ছিল না। কাঠামোর চেয়ে নতুন ইঞ্জিনের ক্ষমতা ছিল বেশি। এতে চলার সময় প্রচ শব্দ হতো। আর লঞ্চটি দ্রুত চলত। এ ছাড়া লঞ্চটির কোনো ইন্স্যুরেন্স করা ছিল না। ইঞ্জিনে ত্রুটি থাকার কারণে চলার সময় বিকট শব্দ হচ্ছিল। চিমনি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ধোঁয়া বের হচ্ছিল না। ফায়ার অ্যালার্ম ছিল না। এর আগেও লঞ্চটি একবার দুর্ঘটনায় পড়েছিল।

তিনটি 'বড় ভুলের' কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে আগুনে পুড়ে যাওয়া 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখ। সেগুলো হলো অনুমোদন ছাড়াই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন সংযোজন, মাত্রাতিরিক্ত গতিতে চালানোর নির্দেশনা এবং আগুন লাগার কথা জানার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া।
.
গতকাল সোমবার সকালে কেরানীগঞ্জ থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর লঞ্চ মালিকের মুখ থেকে এসব স্বীকারোক্তি বেরিয়ে আসে। যদিও তদন্ত সংশ্নিষ্টরা বলছেন, একে ভুল বলা যায় না। এটা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হওয়ার পর এক আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন হামজালাল। লঞ্চে আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা হয়েছে।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ১৯৮৮ সাল থেকে দীর্ঘদিন জাপানে ছিলেন। তিনি ২০০০ সালে দেশে এসে একটি লঞ্চ কেনেন। এখন তার মালিকানায় রয়েছে তিনটি লঞ্চ। 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চটির চার মালিক থাকলেও মূল মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি করতেন হামজালাল।

মঈন আরও জানান, অতিরিক্ত যাত্রীচাহিদা তৈরি করতে লঞ্চটিতে গত নভেম্বরে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়। যাতে অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। বিলম্বে ছেড়ে গন্তব্যে আগে পৌঁছানো গেলে লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা বেশি পাওয়া যায়। এ লক্ষ্যে গত নভেম্বরে ওই লঞ্চে ৬৮০ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিন বদলিয়ে ৭২০ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিন লাগানো হয়। কোনো নামি প্রতিষ্ঠান থেকে এই ইঞ্জিন পাল্টানো হয়নি। একজন সাধারণ মিস্ত্রি বা ফিটারের সহযোগিতায় ইঞ্জিন বদল করা হয়েছে। আগের ইঞ্জিনটি চীনের তৈরি। বর্তমানে জাপানের তৈরি রিকন্ডিশন ও ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়েছে। লঞ্চের ইঞ্জিন পাল্টানোর বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে কারিগরি পরিদর্শন ও অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া করা হয়নি লঞ্চের পরীক্ষামূলক চলাচল। এ ছাড়া কর্মরত তিন কর্মচারীর (মাস্টার ও চালক) লঞ্চ চালানোর অনুমোদন ছিল না।

র‌্যাবের মুখপাত্র আরও জানান, লঞ্চটিতে আগুন লাগার ১০ মিনিটের মধ্যে সুপারভাইজার আনোয়ার মোবাইল ফোনে মালিককে আগুন লাগার বিষয়ে জানান। তবে তিনি কোনো সংস্থা বা জরুরি সেবা কোথাও অবগত করেননি। লঞ্চের কর্মীরা আগুন লাগার পর জ্বলন্ত ও চলন্ত লঞ্চ রেখে সটকে পড়ে। এতে আগুনের ভয়াবহতা আরও বাড়ে। ক্রুদের পরিবার থেকে এখন পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

র‌্যাব জানায়, ঘটনার দিন দুপুরে লঞ্চ মালিকের নির্দেশনা ছিল, যে কোনো উপায়ে অন্য লঞ্চের চেয়ে তিন ঘণ্টা আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। যাতে বেশি যাত্রী পাওয়া যায়। তাই দ্রুতগতিতে লঞ্চ চালানোর নির্দেশনা ছিল হামজালালের। ইঞ্জিন বদলের পর তিনবার বিভিন্ন গন্তব্যে লঞ্চটি গিয়েছিল। যাত্রীদের জন্য কোনো লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা ছিল না। শুধু তার কর্মচারীদের জন্য ২২টি লাইফ জ্যাকেট ছিল। যাত্রীদের জন্য ছিল ১২৭টি বয়া। তবে অধিকাংশ বয়াই যথাস্থানে ছিল না। কাঠামোর চেয়ে নতুন ইঞ্জিনের ক্ষমতা ছিল বেশি। এতে চলার সময় প্রচ শব্দ হতো। আর লঞ্চটি দ্রুত চলত। এ ছাড়া লঞ্চটির কোনো ইন্স্যুরেন্স করা ছিল না। ইঞ্জিনে ত্রুটি থাকার কারণে চলার সময় বিকট শব্দ হচ্ছিল। চিমনি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ধোঁয়া বের হচ্ছিল না। ফায়ার অ্যালার্ম ছিল না। এর আগেও লঞ্চটি একবার দুর্ঘটনায় পড়েছিল।

র‌্যাব বলছে, এ ঘটনায় ঝালকাঠি ও বরগুনায় আলাদা মামলা হওয়ায় লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

'লঞ্চ দুর্ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে': ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চে অগ্নিকা?েফিল?তি চিহ্নিত ক?রে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম। গতকাল সোমবার রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় আহতদের দেখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

নাছিমা বেগম বলেন, ওই লঞ্চে অ?গ্নি?নির্বাপণ ব্যবস্থা কেন ছি?ল না, অ?নিয়মটা কোথায় সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিটি নৌযানে যা?তে অ?গ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, লঞ্চ বা নৌযানগুলোতে শুধু এক?টি ফিট?নে?সের সনদ দিয়ে দায় সারার কো?নো সু?যোগ নেই। প্রতি?নিয়ত এসব লঞ্চের ফিটনেস ঠিক আছে কিনা বা নিয়ম মানছে কিনা সেগু?লো যাচাই-বাছাই করতে হ?বে। সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবলও লাগবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মনে করে, প্রত্যেক মানুষ নিরাপদে যাতে ঘরে ফিরতে পারে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

লঞ্চ চলাচলের বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যেন ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে। ফিটনেস সনদ কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, সেটা মনিটরিং কমিটিকে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বছরের পর বছর ফিটনেস দিলেই হবে না, সেই যানবাহন চলাচলের উপযোগী আছে কিনা সেটিও দেখতে হবে।
এ সময় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, 'ঝালকাঠিতে মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় দগ্ধ এখানে ১৫ জন রোগী আছেন। এর মধ্যে চারজন আইসিইউতে ও তিনজন লাইফ সাপোর্টে আছেন। বাকিরা কেউ শঙ্কামুক্ত নন। আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।'

লাশের পরিচয় শনাক্তে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু :ঝালকাঠি শহরের পৌর মিনি পার্ক এলাকায় গতকাল সোমবার বিকেল থেকে পরিচয় শনাক্তে লাশের দাবিদার স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ঢাকা ফরেনসিক বিভাগ, বরিশালের ক্রাইম সিন ও ঝালকাঠির সিআইডির সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এ নমুনা সংগ্রহ করছে।

'অভিযান-১০' লঞ্চে দগ্ধ হয়ে নিহতদের ৩৯ জনের মধ্যে ২৩ জনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাদের মা-বাবা, ভাইবোন ও সন্তানদের মধ্যে যে কোনো একজনের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঢাকা ফরেনসিক বিভাগের উপপরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের দুটি দল মাঠে কাজ করছে। একটি বরগুনায়, অন্যটি ঝালকাঠিতে। ঝালকাঠিতে সোমবার তিন স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।'

এ ব্যাপারে ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, 'পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় যে ২৩ জনের লাশ কবর দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ডিএনএ নমুনা আগেই সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি নমুনার একটি আইডি নম্বর দেওয়া আছে। এখন স্বজনদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আগের নমুনার সঙ্গে মেলালেই সহজে লাশ শনাক্ত করা যাবে।'

গত বৃহস্পতিবার রাতে ঝালকাঠি সদরের দিয়াকুল গ্রামের কাছে সুগন্ধা নদীতে 'অভিযান-১০' লঞ্চটিতে আগুন লাগে। লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে এই অগ্নিদুর্ঘটনার মুখে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৩৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে এখনও ৪১ যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন।

এদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির এক সদস্য সমকালকে জানিয়েছেন, সোমবার তাদের তদন্তকাজের সময়সীমা থাকলেও তারা শেষ করতে পারেননি। এ জন্য আজ মঙ্গলবার সময় বাড়ানোর আবেদন করবেন।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে ইঞ্জিন রুমে কোনো ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত জরুরি। তারা তা করছেন। এ ছাড়া আগুনের সূত্রপাতের পর ভয়াবহ রূপ নেওয়ার জন্য অনেক কিছুই দায়ী বলে তারা মনে করছেন। এখানে দায়িত্বে অবহেলা, অব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয় রয়েছে। কার কী দায়, কমিটি তা নিরূপণ করছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বেশকিছু সুপারিশমালাও তৈরি করছেন তারা।

অন্যদিকে, র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর লঞ্চটির মালিক হামজালাল শেখ জানিয়েছেন, ঘটনার সময় দুই মাস্টার, দুই চালকসহ লঞ্চে অন্তত ২৬ জন কর্মী ছিলেন। ঘটনার পর এই কর্মীদের কোনো স্বজন তাকে জানাননি যে তারা হতাহত হয়েছেন। তিনিও তাদের সন্ধান পাননি বা তারাও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

মন্তব্য

আরও দেখুন

নতুন যুগ টিভি