শান্তির জন্য পরমাণু শক্তি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সর্বমোট পঠিত : 31 বার
জুম ইন জুম আউট পরে পড়ুন প্রিন্ট

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা এখন পরমাণু শক্তির একটা অংশ। সে হিসেবে আমি বলব সেখানে একটা স্থান আমরা করে নিতে পারলাম এবং সেটা শান্তির জন্য। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পরমাণু শক্তি আমরা শান্তির জন্য ব্যবহার করছি। এ সময় আর যেন কোনো শকুনের থাবা না পড়ে বাংলাদেশের ওপর এবং বাংলাদেশের এই উন্নতি এবং অগ্রগতি যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়, সেজন্যও সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

পরমাণু যুগে প্রবেশ করে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এই পরমাণু শক্তি ব্যবহার হবে শান্তির জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। সেই বিদুৎ যাবে গ্রামের মানুষের কাছে। আর তাতে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে। গতকাল (১০ অক্টোবর) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লির উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। বেলা সাড়ে ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা এখন পরমাণু শক্তির একটা অংশ। সে হিসেবে আমি বলব সেখানে একটা স্থান আমরা করে নিতে পারলাম এবং সেটা শান্তির জন্য। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পরমাণু শক্তি আমরা শান্তির জন্য ব্যবহার করছি। এ সময় আর যেন কোনো শকুনের থাবা না পড়ে বাংলাদেশের ওপর এবং বাংলাদেশের এই উন্নতি এবং অগ্রগতি যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়, সেজন্যও সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতার মসনদে বসে একের পর এক দুর্নীতির ফন্দি করতে থাকে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত ছিল অন্যতম। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করলেও বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ৩ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনে। যেটি বিদ্যুৎ খাতের জন্য অশনি সংকেত ছিল।

তিনি বলেন, এক ফোঁটা বিদ্যুৎও তারা বাড়ায়নি। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। তাই দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি দুর্নীতিতে বিশ্বাসী আর আমরা উন্নয়নে বিশ্বাসী। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ তার বড় প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছি। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন জাতির পিতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করে সেই স্বপ্ন মুছে দিতে চেয়েছিল একটি গোষ্ঠী। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তারা ভেবেছিল তাকে হত্যা করলেই সফল হতে পারবে। তাদের সেই বিশ্বাসঘাতকতা বাঙালি ভুলে যায়নি।

তিনি বলেন, দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে। গ্রামগঞ্জের বাড়িতে বাড়িতে এখন বিদ্যুৎ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে গ্রামগঞ্জ অর্থনৈতিকভাবে আরো সমৃদ্ধ হবে। এ লক্ষ্যে দক্ষিণাঞ্চলে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আর কোনো শকুনের থাবা পড়তে দেওয়া হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎকে দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি আখ্যায়িত করে বলেন, সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলেই আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করবে। আমার ইচ্ছা পদ্মার ওপারেই অর্থাৎ দক্ষিণাঞ্চলে করার। আমরা জায়গা খুঁজছি এবং আশা করি, এব্যাপারে খুব একটা অসুবিধা হবে না। এখানে যদি আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট আমরা করতে পারি তাহলে বিদ্যুতের জন্য আমাদের আর অসুবিধা হবে না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজকে এটা সত্যিই খুব গুরুত্বপূর্ণ দিবস। আজকের দিনটি শুধু বাংলাদেশ নয়, আমার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনটি সত্যিই আমাদের জন্য খুবই একটা আনন্দের দিন। করোনার কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারায় নিজের মনোবেদনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে সশরীরে দেখতে যাব।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা প্রায় তিন থেকে চার স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। অর্থাৎ রি-অ্যাক্টরের কাছে বা একেবারে ভেতরে যারা কাজ করবে তাদেরও অভিজ্ঞতা দরকার, প্রশিক্ষণ দরকার, তার বাইরে আরেক স্তরে যারা আছে তাদের দরকার। তার পাশাপাশি পুরো এলাকার নিরাপত্তার ব্যবস্থাটাও আমরা নিয়ে নিয়েছি।

তিনি বলেন, সেখানে আমরাদের সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাচ্ছি, পুলিশসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজে লাগাচ্ছি। এভাবে আমরা বিভিন্ন স্তরভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি।

২০১৩ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে আমারও কতগুলো প্রশ্ন ছিল, আমরা এটা করার পর এটার নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কারণ বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ, এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করাটা সম্ভব নয়। আমাদের যে চুক্তি হয় তাতে এটাও নিশ্চিত করা হয়, এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সবসময় রাশিয়া নিজেই করবে। সেই বিষয়গুলো আমরা নিশ্চিত করি।

পরিবেশ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, অ্যাটমিক নিউক্লিয়ার পাওয়ারে কখনো পরিবেশদূষণ হয় না, এখন সবখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। কাজেই সেখানে কোনোরকম দুর্ঘটনা ঘটার খুব একটা সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশে অনেকে না জেনে সমালোচনা করেন। আমাদের বাংলাদেশে একটা কিছু করতে গেলে এত সমালোচনা, নানাভাবে নানাজনে, কেউ বুঝে না বুঝে অনেক কথা বলে ফেলেন, অনেক কথা লিখে ফেলেন। টকশোতে অনেকে টক, ঝাল, মিষ্টি কত কথা বলেন, এটা হচ্ছে বাংলাদেশের নিয়ম।

পরমাণুকেন্দ্র স্থাপনের ফলে এ বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের দেশে যারা বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা যারা নিউক্লিয়ার বিষয়ে কাজ করেন সবারই কিন্তু একটা অভিজ্ঞতা হলো। কারণ তাদের ট্রেনিং করাতে হচ্ছে। তাদের রাশিয়া-ইন্ডিয়াতে ট্রেনিং করাচ্ছি।

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুফলের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি যে, এই বিদ্যুৎটা যখন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে, ইতোমধ্যে আমরা কিন্তু সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজও শুরু করে দিয়েছি। কাজেই আমরা ২০২৩ সালের মধ্যে আশা করি এই বিদ্যুৎ পাব। ২০২৪ সালে আমাদের দ্বিতীয় ইউনিট শুরু হয়ে যাবে। কাজেই এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হবে, সেটাই আমরা বিশ্বাস করি।

আইএইএর সঙ্গে চুক্তি সই, বাংলাদেশ অ্যাটমিক অ্যানার্জি কমিশন গঠনসহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতাও অনেক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ’৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর এই উদ্যোগটাই থেমে যায়। যদি জাতির পিতা বেঁচে থাকতেন তাহলে এটা আমরা আরো অনেক আগে করতে পারতাম।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সময়ে আমরা এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম আমরা বিশেষ করে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল আমরা স্থাপন করলাম। যেটা সত্যিই আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। পাশাপাশি, ২০৪১ সালের মধ্যে এই উন্নয়নশীল বাংলাদেশকেই উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়তে চাই। আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। কিন্তু, এখানেই থেমে গেলে চলবে না ’৪১ এ উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমরা গড়ব। দেশ ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করবে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময়ে আগামী প্রজন্ম একটি সুন্দর, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবেই সেটা উদযাপন করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের অনেক পূর্বেই জাতির পিতা এখানে বিদ্যুতায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছিলেন এবং পাকিস্তান সরকারের নিকট তার দাবির প্রেক্ষিতেই ১৯৬১ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণসহ বেশকিছু কাজ তখন সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু, ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার হঠাৎ করে কাজ বন্ধ করে দিয়ে প্রকল্পটি পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নিয়ে বিরাজমান বৈষম্যমূলক আচরণের পুনঃপ্রকাশ ঘটায়। আর স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালেই বঙ্গবন্ধু ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ ‘আইএইএ’র সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেন। সে সময় দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিচালক হিসেবে তার মরহুম স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ারও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জিয়াউল হাসান স্বাগত বক্তৃতা করেন। প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শওকত আকবর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল যন্ত্র রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের সময় আরএনপিপি থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হন। অনুষ্ঠানে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। পারমাণবিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা-ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশন (আইএইএ)-র গাইড লাইন অনুযায়ী এবং সংস্থাটির কড়া নজরদারির মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প (আরএনপিপি) বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।

সূত্র মতে, ইউনিট-১ এর ভৌত কাঠামোর ভেতরে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের পারমাণবিক যন্ত্রাংশ স্থাপন সম্পন্ন হবে। এর ফলে এই ইউনিটের রিঅ্যাক্টর ভবনের ভেতরের কাজ প্রায় শেষ হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে ১২শ’ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকেও ১২শ’ মেগাওয়াট অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৪শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

মন্তব্য

আরও দেখুন

নতুন যুগ টিভি