টিকাদান কতটা জরুরি, কখন দিতে হয় কোনটি

সর্বমোট পঠিত : 40 বার
জুম ইন জুম আউট পরে পড়ুন প্রিন্ট

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো কারণে নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দিতে না পারলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ কেন্দ্রে গিয়ে সেই ডোজটি সম্পন্ন করা উচিত। মনে রাখতে হবে, টিকার ডোজ মিস হলে শিশু পূর্ণ সুরক্ষা পায় না, যা যে কোনো সময় বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় পৃথিবীর সঙ্গে তার লড়াই। আর এই লড়াইয়ে শিশুর সবচেয়ে বড় সুরক্ষা ঢাল হলো টিকা। জন্মলগ্নে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা এই দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়, যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিহার্য।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের টিকাদান ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট ডোজের টিকা গ্রহণ করা শিশুর সুস্থ বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

কেন টিকা জরুরি?

চিকিৎসকদের মতে, টিকা শিশুকে এমন সব মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে, যাতে একসময় লাখ লাখ শিশু প্রাণ হারাতো। এটি কেবল একজন শিশুর ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, বরং পুরো জনপদের 'হার্ড ইমিউনিটি' বা সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। একটি শিশুকে টিকা দেওয়া মানে পুরো সমাজকে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।

সরকারি টিকাদান কর্মসূচি (EPI)

বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সব শিশুকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নির্দিষ্ট কিছু টিকা দেওয়া হয়। এগুলোকে জীবনরক্ষাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিসিজি (BCG): যক্ষ্মা থেকে সুরক্ষা দেয়।

পেন্টাভ্যালেন্ট: ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি (হিব) প্রতিরোধ করে।

ওপিভি/আইপিভি: পোলিও প্রতিরোধ করে শিশুকে পঙ্গুত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচায়।

পিসিভি: নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস ও সেপসিস প্রতিরোধ করে।

এমআর: অত্যন্ত ছোঁয়াচে হাম ও রুবেলা থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখে।

ভিটামিন এ: ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের অন্ধত্ব রোধ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়।

বাড়তি সুরক্ষায় বেসরকারি টিকা

সরকারি টিকার বাইরে কিছু বাড়তি ঝুঁকির হাত থেকে বাঁচতে চিকিৎসকরা বেসরকারি টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে এগুলো বাধ্যতামূলক নয় এবং নির্দিষ্ট মূল্যে হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করতে হয়।

রোটাভাইরাস: ডায়রিয়া প্রতিরোধে।

ভারিসেলা: জলবসন্ত বা চিকেনপক্স প্রতিরোধে।

এইচপিভি: মেয়ে শিশুদের জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

টাইফয়েড ও ইনফ্লুয়েঞ্জা: সিজনাল ফ্লু এবং টাইফয়েড জ্বর থেকে সুরক্ষা দেয়।

কখন কোন টিকা দিতে হবে?

১। জন্মের পর ৬ সপ্তাহের মধ্যে দিতে হবে বিসিজি (যক্ষ্মা), পেন্টাভ্যালেন্ট-১, পোলিও-১, পিসিভি-১ ও মেনিনজোকোক্কাল টিকা। 

২। পেন্টাভ্যালেন্ট-২, পোলিও-২, পিসিভি-২ টিকা দিতে হয় জন্মের ১০ সপ্তাহের মধ্যে।

৩। জন্মের ১৪ সপ্তাহের মধ্যে দিতে হবে পেন্টাভ্যালেন্ট-৩ ও পোলিও-৩ টিকা।

৪। পিসিভি-৩ টিকাদানের সময় জন্মের ১৮ সপ্তাহের মধ্যে।

৫। জন্মের ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে রোটাভাইরাস ও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা দিতে হয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক ম্যাগাজিন
৬। এমআর (হাম ও রুবেলা) ও পোলিও-৪ টিকা দিতে হয় জন্মের ৯ মাসের মধ্যে।

৭। জন্মের ১৫ মাসের মধ্যে এমআর বুস্টার, টিটি (ধনুষ্টংকার) টিকা দিতে হয়।

৮। ডিপিটি বুস্টার ও ওপিভি বুস্টার দেওয়ার সময় জন্মের ১৮ মাসের মধ্যে।

৯। জন্মের ২ বছর পর টাইফয়েড ও কলেরার টিকা দিতে হয়।

১০। জন্মের ৫ বছরের মধ্যে দিতে হয় ডিটি (ডিপথেরিয়া ও টিটেনাস) টিকা।

১১। এইচপিভি (জরায়ু ক্যান্সার রোধে), টিডি/টিটি টিকা দিতে হয় ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যে। 

টিকা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও বাস্তবতা

অনেকে মনে করেন টিকা দিলে শিশু অসুস্থ হয়ে যায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ জানান, টিকা দেওয়ার পর সামান্য জ্বর, ব্যথা বা ফুলে যাওয়া স্বাভাবিক এবং এটি সাময়িক। ১-২ দিনের মধ্যেই এটি ঠিক হয়ে যায়।

আবার অনেকের ধারণা, শিশু বাসায় থাকলে টিকার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংক্রমণ কেবল বাইরে থেকে নয়, বরং পরিবার বা বাতাসের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো কারণে নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দিতে না পারলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ কেন্দ্রে গিয়ে সেই ডোজটি সম্পন্ন করা উচিত। মনে রাখতে হবে, টিকার ডোজ মিস হলে শিশু পূর্ণ সুরক্ষা পায় না, যা যে কোনো সময় বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

মন্তব্য

আরও দেখুন

নতুন যুগ টিভি