শেরপুরে গাজর চাষ করে সফল কৃষকরা


সাঈদ আহাম্মেদ সাবাব:
শেরপুরের নকলায় প্রথমবারের মতো গাজর চাষ কলে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা। আর এ জন্য আরো অনেকেই গাজর চাষ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠছে। গাজর চাষে নামমাত্র শ্রমে, অল্প ব্যয়ে ও স্বল্প সময় লাগে। এতে খরচ খুবই কম লাগে। তাই গাজর আবাদ করে অন্যান্য ফসলের তুলনায় অধিক লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। কৃষকদের দাবি গাজর আবাদে উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ লাভ পাওয়া যায়। উচ্চ মূল্যের এ সবজির উৎপাদন বেশি ও ভালো দাম পাওয়ায় জেলার শেরপুর সদরসহ নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলায় গাজর চাষে কৃষকদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।

এবার জেলার প্রায় সব উপজেলায় স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কৃষকরা কম-বেশি গাজর চাষ করেছেন। এরমধ্যে নকলা উপজেলাতে ৫ হেক্টর জমিতে গাজর চাষ করা হয়েছে। তারা সকলেই লাভবান হয়েছেন। এমন এক কৃষক নকলা উপজেলার জালালপুর এলাকার কৃষক আব্দুল মোতালেব ৩৫ শতাংশ জমিতে বানিজ্যিক ভাবে গাজর চাষ করেছেন। এতে সবমিলিয়ে প্রায় ২২ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, আর ব্যয়বাদে তার লাভ হবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। গাজর চাষে মোতালেবের লাভ দেখে এলাকার অনেক কৃষক এ সবজি চাষে আগ্রহী হয়েছেন। জালালপুরের কামাল মিয়া ও মফিজ মিয়া, চন্দ্রকোনার শামীম মিয়া, ধুকুড়িয়ার তাঁরা মিয়া, ও নজরুল ইসলামসহ অনেকে জানান আগামীতে তারা সকলেই কম করে হলেও গাজ চাষ করবেন। অবার অনেকে জানান আগামীতে তারা বানিজ্যিক ভাবে গাজর করতে জমি নির্বাচন করছেন। উৎপাদন ভালো হওয়ায় আগামীতে গাজর চাষের পরিমাণ ও চাষীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে কৃষকরা জানান।

জালালপুর এলাকার কৃষক মোতালেব বলেন, এক-দেড় যুগ আগেও আমাগো এলাকায় অনেকেই গাজর চাষ কেমনে করন নাগে এডা জানতোই না। কিন্তু এহন গাজর সবাই চিনে আর এ গাজর খুব পরিচিতি পাইছে।

গাজরচাষী মোতালেব আরো জানান, আমরা পতিত জমিকে গাজর চাষের জন্য চাষ করা বাবদ প্রতি কাঠা (৫ শতাংশ) জমিতে ৩/৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আর বিক্রি করণ যায় ৭/ ৮ হাজার টেহা। আমি ৭কাডা জমির গাজর থাইকা পরায় ৫০ হাজার টেহা লাভ করবার পামু।

মোতালেব আরও জানান, গাজর গাছের পাতা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ তথা গুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। তাই গবাদি পশুর খাবারের জন্য পশুর মালিকরা গাজর গাছ তুলে পাতা নিয়ে যান। এতে শ্রমিক খরচ কম লাগছে।

চন্দ্রকোনার শামীম জানান, ২০১৬ সালে প্রথমে ৫শতাংশ জমিতে গাজরের আবাদ করে ভালো ফলন এবং দাম পেয়েছেন। পরের বছর থেকে তার দেখাদেখি অন্যান্য কৃষকরা গাজর চাষ শুরু করেন। নামে মাত্র শ্রমে উৎপাদন বেশি ও ভালো দাম পাওয়ায় উপজেলার কয়েকশ কৃষক এরইমধ্যে গাজর চাষ করা শুরু করেছেন। বাছুর আলগা গ্রামের কৃষক মোকছেদ আলী মাস্টারসহ অনেকেই জানান, তারা কয়েক বছর ধরেই নিজেদের চাহিদা মিটাতে সামান্য পরিমাণে গাজরের আবাদ করছেন।

গাজর চাষী মফিজ মিয়া জানান, প্রতি ১০০ গ্রাম বীজের কৌটা ৪৫০ টাকা করে কিনেছেন। বর্তমানে প্রতিমন গাজর পাইকারি ৪০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা বাজারে ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা করে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। এখন গাজরের ভরা মৌসুম হওয়ায় চাষীরা গাজরের দাম কম পাচ্ছেন। তবে রোজা বা গরম মৌসুমে গাজরের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়; তখন কৃষকরা কয়েকগুণ বেশি লাভ পেয়ে থাকেন।

নকলা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, নকলায় এবছর মোতালেব নামে এক কৃষক প্রথম বারেরমত গাজর চাষ করে লাভবান হয়েছে। গাজর একটি বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন সবজি। উপজেলায় এবছর গত বছরের তুলনায় গাজরের আবাদ বেশি হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। সাধারনত প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ১২ মেট্রিকটন গাজর উৎপাদন হয়ে থাকে। এরইমধ্যে কৃষকরা গাজর উত্তোলণ শুরু করেছেন। গাজরে কৃষকরা প্রায় দ্বিগুণ লাভ পাচ্ছেন। অন্যান্য ফসলের তুলনায় গাজর চাষে লাভ বেশি পাওয়া যায়। তাই যে কেউ গাজর চাষ করে স্বাবলম্বী হতে পারেন বলে তিনি মনে করেন। নকলার মাটি গাজর চাষের উপযোগী হওয়ায় আগামীতে এ সবজির আবাদ কয়েকগুণ বাড়বে। এতেকরে এখানকার উৎপাদিত গাজরে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য ফসলের মতো রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মুহিত কুমার দে জানান, শেরপুর জেলার চরঅঞ্চলে বিশেষত সদরসহ, শ্রীবরদী ও নকলা উপজেলায় গাজরের চাষ হচ্ছে। এবছর জেলার প্রায় ১৬৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। গাজর একটি সম্ভাবনাময় ফসল। গাজরে ভিটামিন এ” তে পরিপূর্ণ থাকায় এর চাহিদা বাজারে প্রচুর। গাজর দামী ফসল হওয়ায় কৃষকরা বাজারে দাম ভালো পাচ্ছেন। অনান্য ফসলের চেয়ে গাজর লাভজনক হওয়ায় আশা করা যায় শেরপুরের কৃষকরা গাজর চাষী দিনদিন বাড়বে। আগামিতে এর আবাদ কয়েকগুণ বাড়বে বলে তিনি জানান। গাজরের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

Top
ঘোষনাঃ