ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক পটভূমি- তালাত মাহমুদ

ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক পটভূমি নিয়ে কিছু লেখার দুঃসাহস আমার নেই। সংশ্লিষ্ট দিব্যদ্রষ্টারাও বলেন, কাজটা তত সহজ নয়। একে তো ‘পটভূমি’ শব্দটাই দূরবর্তী পশ্চাৎমন্ডলের ইঙ্গিত বহন করে। তার মাঝে আবার যে কোন পরিস্থিতি বা আন্দোলনে সামাজিক বা রাজনৈতিক পটভুমি তবু ঐতিহাসিক প্রবাহের অনেকখানি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। আদর্শিক পটভূমি অন্তর চেতনার সাথে যুক্ত। তার অবদান, পরিচয় ও প্রভাব সূক্ষ্মতর। তাই ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক পটভূমি সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে তারাও ইতস্তত হিমশিম খান।

কারণ যে ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীকার আন্দোলন, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের অসহযোগ আন্দোলন, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরও নানা পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট রচনায় জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে; সেই ভাষা আন্দোলনের চেতনা যেমন ইতিহাসের আদিমতম সূতিকাগার থেকে উৎসারিত তেমনি এর লক্ষ আজও বাস্তবায়ন হয়নি। ‘যাদের একবিন্দু রক্ত থেকে লাখোবিন্দু রক্তের সৃষ্টি/আর প্রতিটি রক্ত কণিকা থেকে/অগণিত গল্প প্রবন্ধ কবিতা গান /আর নতুন ইতিহাসের স্বতঃস্ফুর্ত আত্মপ্রকাশ/শহীদ আমি তাদেরই বলি/মুক্তির আলোকে আজ’। মুক্তির দূত হিসেবে বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণার উৎসÑ সেই সালাম, বরকত, জব্বার আর রফিকের প্রতি আমাদের যথারীতি কর্তব্য পালনও অধুণা প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

আমার জন্মের সাড়ে পাঁচ বছর আগে ভাষা আন্দোলনের জন্ম। নিজের দেখা কোন ঘটনা নয়, বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে আর ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারী (অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, অধ্যক্ষ আশরাফ ফারুকী, অধ্যাপক আব্দুল গফুর সহ) ক’জন ভাষা সৈনিকের কাছে শোনা কথাই আলোচ্য আলেখ্যে আমাকে বিবৃত করতে হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই আন্দোলনটি একটি সাংস্কৃতিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে। ‘তমুদ্দুন মজলিশ’ নামে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে সর্বপ্রথম একটি বই বের করে। সংগঠনটি পাকিস্তানের জন্মলগ্নে ‘রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গ’ নিয়ে কয়েকটি আলোচনা সভারও আয়োজন করে এবং এ ব্যাপারে সুধীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বুদ্ধিজীবীদের একটি সচেতন অংশ মনে করতেন যে, বাংলা ভাষাকে যদি সর্বস্তরের শিক্ষার মাধ্যম না করা হয়, তাহলে পূর্ববঙ্গের জনগণের উপর উর্দূভাষীদের আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি হবে স্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিরোধী। দেশের সংখ্যাগুরু অধিবাসীদের বাংলাভাষাকে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দিলে আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকার বা স্বাধীনতা কথাগুলো অর্থহীন হয়ে পড়বে।

ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার সামান্য আগে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশের অনুকরণে উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। তখন এই অভিমতের কেউ কোন প্রতিবাদ করেননি। তবে সে সময় একমাত্র ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথমেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এবং দৈনিক আজাদে তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর প্রবন্ধের শেষে উল্লেখ করেন……..বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দূ বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহন রূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দূ ভাষার স্বপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেনÑ আমি একজন শিক্ষাবিদ হিসাবে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবল বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতি বিরোধীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্ব শাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের নীতি বিগর্হিতও বটে।

এই প্রবন্ধের পর ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ১৭ পৌষ ১৩৫৪ সনে ‘তকবীর’ পত্রিকায় ‘পূর্ব পাকিস্তানে ভাষার সমস্যা’ শিরোনামে আরও একটি প্রবন্ধ লেখেন। সে প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেক বাঙ্গালীর জন্যে প্রাথমিক শিক্ষনীয় ভাষা অবশ্যই বাংলা হইবে। ইহা জ্যামিতিক স্বীকৃত বিষয়ের ন্যায় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেহই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না। এই বাংলাই হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’…..।

ভাষা আন্দোলনে জড়িত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারী এবং ছাত্র-জনতা। এটি ছিল মূলতঃ মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন। মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক জীবন ছিল প্রধানত চাকুরীর উপর নির্ভরশীল। তাঁরা দেখেছিলেন পূর্ব বঙ্গের (পূর্ব পাকিস্তান) সচিবালয়, রেডিও, রেলওয়ে, পোস্টাল বিভাগ প্রভৃতি প্রাদেশিক চাকুরীতেও উর্দূভাষীরাই উচ্চপদে আসীন। পূর্ব বঙ্গের নিম্ন পদস্থ সরকারী কর্মচারীরা নানাভাবে নিজেদের বঞ্চিত এমন কি অপমানিত মনে করতে থাকে। উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মচারীদের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা পূর্ব বঙ্গীয় ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কেন্দ্রীয় সরকারের আমদানী লাইসেন্স তো অবাংলা ভাষীদের একচেটিয়াই ছিল। সুতরাং বাংলাভাষার দাবীর মাঝে গোটা পূর্ব বঙ্গীয় শিক্ষিত এবং ব্যবসায়ী মহল তাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার মূলমন্ত্র নিহিত দেখতে পান।

পাশাপাশি এদেশের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ আরও বুঝতে পারেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানীরা এদেশের মানুষকে (মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান) অশিক্ষিত, মুর্খ, দরিদ্র আর নিম্ন শ্রেণির ও নিম্ন বর্ণের মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করে আসছে। তারা পূর্ব বঙ্গকে দারিদ্র্যপীড়িত, খরা-দুর্ভীক্ষ, ঝড়-জলোচ্ছাস, অতিপ্লাবন আর পশ্চাৎপদ ও অনুন্নত এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দেশ হিসেবে অবহেলা করে আসছেÑ তখন এদেশের অধিকার বঞ্চিত চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী মহল ধরেই নিয়েছিলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে বাঙ্গালীদের একত্রে বসবাস করা আর সম্ভব নয়। তাছাড়া ১২শ’ মাইলের ব্যবধানে (পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান) সম্পূর্ণ পৃথক দু’টি ভু-খন্ড নিয়ে একটি রাষ্ট্র থাকতে পারে না। পৃথিবীতে এমন রাষ্ট্র আর একটিও নেই। সুতরাং বাঙ্গালীরা তখন থেকেই পৃথক হওয়ার স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে। নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সভ্যতা এবং স্বাজাত্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে বাঙ্গালী আশায় বুক বাঁধেÑ একদিন তারা স্বাধীন হবে। বাঙ্গালীরা এও জানে যে, অধিকার আদায় করে নিতে হয়।

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রীপরিষদ প্রধান খাজা নাজিমউদ্দিন সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিনি তার ওয়াদা ভঙ্গ করে পাকিস্তানের কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতই একনায়কত্ববাদী সুরে ‘উর্দূ এবং উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। এই রিপোর্টটি অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ভাষা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে এবং দিনে দিনে তা আরও বেগবান হয়ে চরম আকার ধারণ করে। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারী করে এবং একমাসের জন্য সভা ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রকাশ থাকে যে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তৎকালে ঢাকায় ঘোষণা করেন যেÑদটৎফঁ ধহফ টৎফঁ ংযধষষ নব ড়হষু ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ ঢ়ধশরংঃধহ.

বলা আবশ্যক, ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তৎকালের প্রধান প্রধান সংবাদপত্র সমূহ তথা অবজারভার, আজাদ, মিল্লাত, ইনসাফ, নওবেলাল, সৈনিক, সংগ্রাম ও আমার দেশ। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সে সময় আরো ২০/২৫টি সাপ্তাহিক, অর্ধ সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করে ‘মর্ণিং নিউজ’ ও ‘সংবাদ’। ভাষা আন্দোলনে বিরোধীতা করায় বিক্ষুব্ধ জনতা ‘মর্ণিং নিউজ’ অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং প্রয়াত জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক সেদিনের তরুণ সাংবাদিক ফজলে লোহানী ‘সংবাদ’ থেকে পদত্যাগ করেন।

আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আব্দুস সালাম, মজিবুর রহমান খাঁ, অধ্যাপক আবদুল গফুর, মোহাম্মদ মোদাব্বের, ফয়েজ আহমেদ এবং নূরল ইসলাম পাটোয়ারীসহ বহু বিচক্ষণ সাংবাদিক ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে আবুল কালাম সামসুদ্দিন ও মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ পুলিশের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগ করেন। শেরেবাংলা এ, কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসনী, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ও শামসুদ্দিন আবুল কালাম ব্যতীত অন্য কোন রাজনৈতিক নেতারও তেমন কোন ভূমিকা ছিলনা। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন এবং ভাষা আন্দোলন চলাকালেও তিনি বন্দী ছিলেন।

পাকিস্তান অবজারভারে ভাষা আন্দোলনের সংবাদ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতো। খাজা নাজিমউদ্দিনের সমালোচনা করে অবজারভারে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হলে স্বৈরাচারী সরকার ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি অবজারভারের প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সম্পাদক আব্দুস সালাম ও প্রকাশক হামিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। পটভুমিতে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকাই প্রায় এককভাবে লড়াই করছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা ২২ তারিখে ‘দৈনিক আজাদ’ এর প্রথম পাতায় বড় বড় হেড লাইনে প্রকাশিত হয়Ñ“ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে ছাত্র সমাবেশের উপর পুলিশের গুলীবর্ষণ : বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রসহ চার ব্যক্তি নিহত ও ১৭ ব্যক্তি আহত : হাসপাতালে প্রেরিত আহতদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক : স্কুলের ছাত্রসহ ৬২ জন গ্রেফতার॥ গুলীবর্ষণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তদন্তের আশ্বাস দান”।

২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। দীর্ঘদিন পর সেদিন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসার কথা ছিল। সকালে ৩/৪’শ ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হয়। তাদের প্রাদেশিক পরিষদের দিকে যাওয়ার কথা। ভাষার দাবী সম্পর্কে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল এদের উদ্দেশ্য। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৪৪ ধারা জারী করায় চারদিকে একটা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বেলা ১১টার দিকে পুলিশের সাথে ছাত্রদের ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। ছাত্ররা চাইছিল বেরিয়ে মিছিল করতে। পুলিশ বাধা হয়ে আছে। এক পর্যায়ে একটা ঢিল ডিআইজির পায়ে গিয়ে লাগলে পুলিশ ছাত্রদের প্রতি কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলীবর্ষণ করে এবং ছাত্রদের নাজিমুদ্দিন রোডের দিকে ধাওয়া করে। ছাত্রদের মাঝে উত্তেজনা ক্রমশঃই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এদিকে মাতৃভাষার দাবীতে শহরে কয়েকটি খন্ড মিছিল বের হলে পুলিশ সেখানেও এলোপাথারী গুলীবর্ষণ করে।

বিকেল ৩টায় ছাত্ররা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে জমায়েত হয়। মন্ত্রী হাসান আলী ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আব্দুল্লাহ বাকী (মুসলিম লীগ) গাড়ীতে করে প্রাদেশিক পরিষদের দিকে যাচ্ছিলেন। একটি বালক হাত তুলে গাড়ী থামায়। ছাত্ররা চাকার হাওয়া ছেড়ে দেয়। ঘটনাটি ঘটে প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের কাছেই। (এখন যেখানে জগন্নাথ হল)। আবারও পুলিশের সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ তখন মরিয়া হয়ে ছাত্র-জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাঁদুনে গ্যাসের ঘণ ধুয়ায় একাকার করে তুলে সমস্ত এলাকা। হিংস্র-হায়েনা পুলিশের এলোপাথারী গুলীর শব্দের সাথে সাথে ভেসে আসে ক’টি আর্তনাদ (!) যে আর্তনাদের তীব্র কঠিন শাণিত শোণিত ধারা এদেশের সংগ্রামী মানুষের অধিকার আদায়ের দাবীতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জাতিকে যুগে যুগে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। উদ্বুদ্ধ করে আসছে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের চেতনাকে ধারণ করতে।

সেদিন পুলিশের গুলীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কৃতি ছাত্র সালাহউদ্দিন (২৬), আবুল বরকত (২৫) আব্দুল জব্বার (৩০) এবং বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিকউদ্দিন আহমদ (২৭) শাহাদত বরণ করেন। এই চার বীর শহীদসহ ভাষা আন্দোলনে নাম না জানা অন্যান্য শহীদের স্মরণে আব্দুল গাফফার চৌধুরী রচিত ও শহীদ আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিতÑ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’…গানটি প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের সবার করুণ কাতর কন্ঠে বেদনা বিধুর সুরে উচ্চারিত হয়ে আসছে!

পূর্ব বঙ্গের আত্মপ্রতিষ্ঠার বীর সেনানী সালাম, বরকত, জব্বার ও রফিকের আত্মহুতিতে সৃষ্টি হল নতুন ইতিহাস। রচিত হল পরবর্তী আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকার আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং অবশেষে স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদৃঢ় ভিত্তি। ইতিহাসে যুক্ত হলোÑ ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা আত্মহুতি আর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি প্রিয় মাতৃভাষা, একটি পতাকা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম মানচিত্র। যার নাম বাংলাদেশ।

বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষাকে অর্জন করার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। একুশ আমাদের অহঙ্কার। একুশ আমাদের উত্তরণের সিঁড়ি। এই সিঁড়ি বেয়েই আমাদের জাতীয় অর্জনগুলো এসেছে। জাতি হিসেবে সারাবিশ্বে আমাদের পরিচিতি এসেছে চির সংগ্রামী ও বীরের জাতি হিসেবে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর আম্র কাননে সিরাজউদদৌলার পরাজয় ও করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী জাতির উপর নেমে আসে বেনিয়া ইংরেজদের অমানুষিক নির্যাতন। তারা শাসন শোষণ আর নিপীড়নের স্ট্রীম রোলারে নিষ্পিষ্ট করে এই হতভাগা জাতিকে! এই পৈশাচিক শাসন ও শোষণের সাময়িক বিরতি ঘটে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে। অতঃপর আবার শুরু হয় পাকিস্তানী শাসন-শোষণ ও জুলুম-অত্যাচার। আর তা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর লাঞ্ছণা-বঞ্চণা এবং নির্যাতনের শিকার হয়েও এ জাতি তার অভীষ্ঠ লক্ষে পৌঁছতে এতটুকু পিছপা হয়নি। পুরনো এবং সেকেলে ধ্যান ধারণাকে পরিহার করে সমৃদ্ধ জাতি ও উন্নত দেশ গঠনে ‘দিন বদলের আহ্বান’ জানাতে ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙ্গালীদের সামনে বার বার আসে।

কিন্তু এত ত্যাগ তিতিক্ষা আর লড়াই সংগ্রামের অর্জন আজও চূড়ান্ত রূপ লাভ করে‘নি। অফিস আদালত সহ আজও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে ঘুষ-দুর্নীতির প্রকাশ্য চর্চা চলছে সর্বত্র, সুযোগ ও ক্ষমতা পেয়ে অবৈধ পন্থায় অস্বাভাবিক অর্থ-বিত্তের মালিক বনে যাচ্ছে অনেকে। এসব ভয়াবহ সংক্রামক প্রতিরোধে যারা নিয়োজিত তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজে। ফলে পরমত সহিষ্ণুতা আর গণতন্ত্র চর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানী স্বৈরতন্ত্রে প্রেতাত্মা আমাদের উপর বারবার ভর করছে। আমরা মূলধারা থেকে বৃন্তচ্যুৎ হয়ে যাচ্ছি।

১৯৫২ থেকে আজোবধি বাঙ্গালী জাতির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের শোকাবহ ইতিহাস আর চাওয়া না পাওয়ার দীর্ঘ ফিরিস্তি ঘেটে নতুন প্রজন্মকে কেবল এই কথাটিই জানাতে চাই, ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক পটভুমিতে আমরা যা খুঁজে পেয়েছি তাতে কেবল বহিঃশত্রুর রাহুগ্রাস থেকে পরিত্রাণ আর ঘণ ঘণ আত্মহুতি দেওয়ার জন্যই এ আন্দোলন হয়নিÑ জাতির সকল শ্রেণী পেশার নারী-পুরুষের সামাজিক নিরাপত্তা বিধান তথা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জন অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণের তাগিদটিও এখানে নিহিত রয়েছে। কাজেই আসুন, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। আসুন, ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচার আর সকল অন্যায় অনাচারকে পরিহার করে আমরা সকল শহীদের আত্মার শান্তি দেইÑ নইলে এ রক্তদানের পালা শেষ হবে না। না না না………

লেখক: জিলবাংলা সাহিত্য পুরষ্কার প্রাপ্ত কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং প্রধান সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা রিপোর্ট।

Top
ঘোষনাঃ