বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য কি নতুন কিছু – শিব শংকর কারুয়া

আমার বাবা একাত্তুরে রক্ত দিয়ে শহীদ হয়েছেন। রাজনৈতিক চেতনা আমাদের রক্তেই মিশে আছে। কলমের নিবে আমাদের অজস্র কথা জমা হয়ে থাকে ।
বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য বিতর্ক কী নতুন কিছু! এই চেতনার নামেই তো মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচারণ করা হয়েছে। শহীদ মিনারে শহীদদের নামে পুষ্পস্তবক অর্পণ বিতর্ক কী শেষ হয়ে গেছে? এই শক্তি ঘাপটি মেরে থাকে। সুযোগ পেলেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।
খোঁজ নিয়ে দেখুন ভাস্কর্য বিরোধিতার নামে যারা মাঠে নেমেছে তাদের পরিবারের কে কে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে লড়াই করেছে!জাতীয় সঙ্গীত শহীদ মিনার বাংলা নববর্ষ রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল ইসলাম জীবনানন্দ শাড়ী পরা টিপ দেওয়া সঙ্গীত চর্চা নাটক সিনেমা থেকে শুরু করে কোন বিষয়ে কী ওদের সায় আছে! অথচ একজন বঙ্গবন্ধু কিংবা একটি বাঙালি জাতি এইসব প্রশ্নে আপোষহীন ছিলেন বলেই তো শেখ মুজিবের হুংকারে আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে জয়বাংলা শ্লোগান আমাদের জীবন জয়ী মন্ত্র। ভাস্কর্য ভাঙা এই শক্তি কী কোন দিন জয়বাংলা শ্লোগান দিয়েছে? শহীদ জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি পড়েছে! জহির রায়হানের জীবন থেকে নেওয়া সিনেমা কখনো দেখেছে!কিংবা জয় বাংলা বাংলার জয়…. জাগরণের গান গেয়ে যুদ্ধ করেছে!


ডিসেম্বর এলেই কেমন একটা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে ঘিরে ধরে। চলচ্চিত্রের মতো মনের ভেতর ছবি তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি আমি শেরপুর কলেজে চাকরি করতাম তাহলে কি হতো তখন? একদল ছেলে এসে হয়তো আমার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতো স্যার,এখন আমরা কি করবো!
আমিও গোপনে পরামর্শ দিতাম। যুদ্ধে নাম লেখাতে হবে।ট্রেনিং করতে হবে। কেউ কেউ আবার ধমকে উঠতো। শিবু স্যারের সাথে থেকে জীবনটাকে নষ্ট করো না। পাকিস্তানি মিলিটারী খুবই শক্তিশালী।
সৌরভের মুখে তখন আরও উসকো খুসকো দাড়ি। রিপনও বেশ চঞ্চল। মঈন বলছে, স্যার আমাদের একটা কিছু করতেই হবে।মোনেম অন্তু ছটফট করছে। ডিবেটিং ক্লাবের সদস্যরা কলেজ মাঠে সমবেত হয়েছে। সবচেয়ে সাহসী আর ডানপিটেরাও আজ জড়ো হয়েছে। ওরা বিতর্ক করে না। কিন্তু যুক্তি আর বুদ্ধির মোহনায় সব সময় সামিল থেকেছে। কলেজ ক্যাম্পাস মিছিল মিটিংএ সরগরম করে রাখে। জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে এখনই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।
বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। আর তো ভাল ছেলের মতো ঘরে বসে থাকা যায় না। ভাল ছেলের সংজ্ঞা শিবু স্যারের কাছে অন্যরকম। দুঃসময়ে যে দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দেয় না সে আবার কিসের ভাল ছাত্র!
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবতে গেলেই সেলুলয়েডের ফিতার মতো এই দৃশ্যপটই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
ডিসেম্বর আমাকে আবেগ প্রবণ করে ফেলে। বন্দুকের ট্রিগার টিপার আওয়াজ আমার কানে ভেসে আসে।
আমি কী ঘরে বসে থাকার মানুষ। দামালদের সামাল করে আমিই হয়তো চলে যেতাম মেলাঘরের ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণে।

লেখকঃ বিভাগীয় প্রধান, রাস্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, শেরপুর সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।

Top
ঘোষনাঃ