নালিতাবাড়ীতে অসহায় আব্দুলের খবর কেউ রাখে না!

বিশেষ প্রতিনিধি: ‘অসহায় জীবনের কেউ খবর নেয় না। খাইয়া না খাইয়া বাইচ্চা আছি। অহন খুব কষ্ট কইরা চলতাছি, এই বাঁচার দাম নাই। একটা কম্পিউটার কিনবার পাইলে কোন রকম চলবার পাইতাম’।

মনের ভেতর জমে থাকা পুঞ্জিভুত কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন, শেরপুরের নালিতবাড়ী উপজেলার বারমারী এলাকার আন্দারুপাড়া গ্রামের মৃত- আমজাদ আলীর ছেলে আব্দুর রহমান ওরফে আব্দুল (৩৫)। ৪ ভাই ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছেলে আব্দুল জন্মের ৮ বছর বয়সে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে পঙ্গুত্ব জীবন বরন করেছেন। পায়ে হেটে চলার ক্ষমতা নেই। মানুষের দেয়া হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন তিনি। বিবাহিত আব্দুল পৈত্রিক সুত্রে মাত্র ৫ শতাংশ তথা এক কাঠা বাড়ি ভীটা জমি পেয়েছেন। এছাড়া আবাদি কোন জমিজমাও নেই।

আব্দুল জানায়, জন্মের ৮ বছর বয়সে প্রথমে ডান পায়ের গোড়ালী ফুলে যায়। তারপর ধীরে ধীরে সম্পুর্ণ অবশ হয়ে সরু ও দুই পা একত্রে জড়ো হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে কবিরাজী চিকিৎসা করলেও কোন কাজ হয়নি। বর্তমানে এভাবেই অসহায় জীবন পাড় করছেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালে স্থানীয় লোকদের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে বিশেজ্ঞ ডাক্তার আব্বাস উদ্দিনের নিবির তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসা গ্রহন করেন। এসময় ডাক্তার তার ডান পায়ে অস্ত্র পাচার করেন এতে পায়ের জড়তা ছাড়ে। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছিলেন বাম পায়ে আরো ৩টি অপারেশন করতে হবে। তাহলে সম্পুর্ণ সুস্থ্য না হলেও অন্ততঃ হুইল চেয়ারে নয় লাঠিতে ভর করে কোন রকমে পায়ে হাটতে পারবেন।

ডাক্তার আব্দুলের চিকিৎসার খরচের সহযোগীতাও করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ডাক্তার আব্বাস উদ্দিনকে অন্যত্র বদলী করায় আব্দুলের আর চিকিৎসা হয়নি। নতুন ডাক্তার যোগদান করে আব্দুলকে পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ছুটি দেয়। আর বাকি ৩টি অপারেশন করনো আর সম্ভব হয়নি। এভাবেই আব্দুল টানছে সংসারের ঘানি। এখন হুইল চেয়ারই একমাত্র ভরসা। আব্দুলের ঘরে ৮ বছরের আলিম, ৪ বছরের আনিকা ও ১ বছরের আহমুদুল্লাহকে নিয়ে ৩ সন্তান এবং স্বামী-স্ত্রীসহ সংসারের সদস্য সংখ্যা মোট ৫ জন আছেন। আব্দুল জানায়, বর্তমান বাজারে পঙ্গু ভাতার সামান্য টাকা দিয়ে সংসারের খরচ হয় না। কিন্তু স্ত্রী পুত্রসহ এই ৫ জনের সংসারের আহার যোগাবে কিভাবে। উপায়ান্তর খুজে না পেয়ে পাশ্ববর্তী বারমারী বাজারে একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে প্রথম দিকে গ্যাস ম্যাচের গ্যাস ভরানো, মোবাইল চার্জ করা ও লাইট মেরামতের কাজ শুরু করেন। এতে প্রতিদিন রোজগার হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এখান থেকে ঘর ভাড়া ৬০০ টাকা, জেনারেটর ভাড়া ১৫০ টাকা, বিদ্যুত বিল ৪০০ টাকা দিতে হয়। তার এই করুন হাল দেখে বারমারী বাজার কমিটি নাইট গার্ডের বেতনের টাকা নেয়া বাদ দিয়েছেন। বর্তমানে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন যায়, রাত কাটে আব্দুলের।

আব্দুল আরো জানায় তার ইচ্ছার কথা, বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি কম্পিউটার কিনতে পারলে তার আয় আরেকটু বাড়তো। তিনি বলেন, আমার ট্যাহা নাই, কম্পিউটার কিনে মোবাইলের গান, রিংটোন ডাউনলোড করে টাকা রোজগার করতে পারতাম। তবে আমার বিশ্বাস ওহনও দুনিয়ায় ভালা মানুষ আছে আমারে যদি কোন ধনী মানুষ একটা কম্পিউটার দান করতো তাইলে আমার খুব উফুকার অইতো। আত্মবিশ্বাসী আব্দুল কর্মে বিশ্বাসী, কাজ করে খেতে চায়। কিন্তু পায় না সহযোগিতা। নিজের জীবনকে অভিশপ্ত মনে না করলেও পঙ্গুত্বের কথা মনে করে খুব কষ্ট পায়। পোলিওর থাবায় পঙ্গু জীবনে মনে প্রাণে স্বপ্ন দেখেন একটি কম্পিউটার ক্রয়ের। তিনি বলেন, স্বপ্ন পুরণ হবে কি না জানি না। তবে বেচেঁ থাকতে চাই সমাজের বোঝা হয়ে নয় অন্য দশজন মানুষের মতো।

Top
ঘোষনাঃ